লম্বা হওয়ার সহজ উপায় নেই। উচ্চতা বৃদ্ধি মূলত বংশগত। তারপরেও কিছু কিছু খাদ্যাভ্যাস, লম্বা হওয়ার ব্যায়াম ও কিছু নিয়ম মেনে চললেও কিছুটা লম্বা হওয়া যেতে পারে। জেনে নিন লম্বা হওয়ার উপায় বিস্তারিতভাবে।

লম্বা হওয়ার উপায়

উচ্চতা বৃদ্ধির মূল উপাদান গ্রোথ হরমোন এমন একটি পদার্থ যা শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়। বেশী পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালরি, খনিজ পদার্থ, প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন খাদ্যাভ্যাস যা মানবদেহের নতুন কোষ গঠন, হাড় নির্মাণ এবং সেলের গঠন নির্মাণে সহায়তা করে। তবে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত যে, মানবদেহ বৃদ্ধির ৮০% নির্ভর করে জিনতত্ত্বের উপর। আর বাকি ২০% অন্যান্য কিছু কৌশল বা পরিবেশের উপর।

৮-১১ ঘণ্টা ঘুম ও বিশ্রাম
প্রাকৃতিক উপায়ে লম্বা হবার সবচাইতে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে ঘুম। ঘুম আমাদের মানসিক ও শারীরিক শান্তির পাশাপাশি ঘুমের সময় দেহ গঠনের টিস্যুগুলো কাজ করে। আমাদের দেহে শরীর গঠনের হরমোন প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপন্ন হতে থাকে পরিমিত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রাম নেয়ার মাধ্যমে। এরফলে আমাদের উচ্চতা ও শারীরিক গঠন বৃদ্ধি পায়। তাই বয়স অনুযায়ী ৮-১১ ঘণ্টা ঘুম ও বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করবেন।

লম্বা হওয়ার ব্যায়াম ও খেলাধুলা
শৈশব থেকেই যারা সুঠাম দেহের অধিকারী হয় এবং অনেক বেশি খেলাধুলা করে থাকে তাদের উচ্চতা অন্যদের তুলনায় বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি সাতার, ফুটবল, আরোবিক্স, ক্রিকেট, টেনিস, বাস্কেটবলের মতো খেলার মাধ্যমে দেহের উচ্চতা বৃদ্ধি করে লম্বা হওয়াতে সহায়ক। এছাড়া হাঙ্গিং, স্ট্রেচিং ধরণের লম্বা হওয়ার ব্যায়াম করতে পারেন। কারণ যারা সুঠাম দেহের অধিকারী এবং অনেক বেশি খেলাধুলা, ব্যায়াম করেন তারা স্বভাবতই অন্যদের তুলনায় একটু বেশি পুষ্টিকর খাবার খেয়ে থাকেন। এতে দুটো ব্যাপারই কাজ করে উচ্চতা বৃদ্ধিতে।

জানতে চাই  ডেঙ্গু জ্বরে করনীয় ও ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা

সঠিকভাবে ঘুমান
লম্বা হওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে হাঁটাচলা করার সময়, বসার সময় সঠিকভাবে ঘাড় ও মেরুদণ্ড সোজা রাখবেন। ঘুমানোর সময়ও ঘাড় সোজা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা লম্বা হবার ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকে।

পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর খাবার
লম্বা হওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কোন বিকল্প নেই। পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর খাবার দেহের হাড় ও কোষের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

  • লম্বা হওয়ার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস। প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক যুক্ত খাদ্য খেতে হবে।
  • আমাদের দেহে ভিটামিন ডি গ্রোথ হরমোন উৎপন্ন করে।
    আমাদের দেহে ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠন এবং হাড় মজবুত করে। দুধে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে, দুধের পরিবর্তে ডাল ও বাদাম খেয়ে দুধের অভাব অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।৬০ গ্রাম ডালে প্রায় ২৫০ মিঃ লিঃ দুধের সমান প্রোটিন আছে। এছাড়া দই, সবুজ শাকসবজীতেও ক্যালসিয়াম পাবেন।
  • ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, এবং কার্বোহাইড্রেট কোষ গঠন ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
    আমাদের দেহে প্রোটিন পেশীর বৃদ্ধি ও হাড়ের সঠিক বিকাশে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণ চর্বিহীন প্রোটিন খাবার খাবেন। চর্বিহীন প্রোটিন খাবার বলতে মুরগীর মাংস, ডাল, মাছ, দুধ এই ধরনের খাদ্য।
  • উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভাত এর বদলে রুটি খাওয়া ভাল।
  • এছাড়াও খাবার হজম ও সম্পূর্ণ দেহে পুষ্টি পৌঁছানোর বিষয়ের উপরও লম্বা হওয়া নির্ভরশীল। সুষম খাদ্য নিয়মিত খাবার চেষ্টা করবেন।

নিয়ম মেনে খাওয়া দাওয়া করুন
সঠিক সময় অনুযায়ী খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন। লম্বা হওয়ার জন্য দিনে তিনবার খাওয়ার পরিবর্তে দিনে অন্তত পাঁচ বার খাওয়া দাওয়া করার অভ্যাস করবেন। অসময়ে খাবার খাওয়া, এক বেলায় খাওয়া অন্য বেলায় না খাওয়া, এক বেলায় বেশি খাওয়া অন্য বেলায় কম খাওয়া, এমন করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। নিয়ম না মেনে খাওয়া দাওয়া করা লম্বা হওয়ার জন্য বিরাট প্রতিবন্ধকতা সরূপ।

জানতে চাই  কুষ্ঠ রোগ (leprae), উপসর্গ, লক্ষণসমূহ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

লম্বার হওয়ার জন্য কোন ঔষুধ নয়
লম্বা হওয়ার সহজ উপায় হিসাবে সবচেয়ে কার্যকর ও খুবই ব্যয়বহুল উপায়। লম্বা হওয়ার জন্য মানবদেহে ইঞ্জেকশন দিয়ে হরমোন বৃদ্ধি করা যায়। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি, ফলে একজন ডাক্তার কখনই এরকম কিছু প্রেস্ক্রাইব করবে না। লম্বা হওয়ার জন্য বাজারে অনেক ঔষুধ পাওয়া যায়। এগুলোও আপনাকে লম্বা হওয়ার নিশ্চয়তা দিলেও আসলে এগুলো ব্যবহারে লম্বা হওয়ার পরিবর্তে স্বাস্থ্যহানি করবে।

লম্বা হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে এমন কিছু করবেন না
লম্বা হবার জন্য শরীরের উপর চাপ সৃষ্টি করে এমন ভারি কোন জিনিস বহন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভারি জিনিস বহনের কারনে মেরুদণ্ডের উপর চাপ পড়ে ফলে লম্বা হবার পথে বাধা প্রাপ্ত হয়। যেমনঃ পানি ভর্তি বালতি, ভারি স্কুল ব্যাগ। উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য কিছু জিনিস এড়িয়ে চলতে হবে। পচা, বাসি খাদ্য একেবারে খাওয়া যাবেনা। এমনকি সকালে না খেয়ে কাজে যাওয়া ত্যাগ করতে হবে। জাংক ফুড, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি, কার্বোনেটেড ড্রিংকস, ড্রাগ, এলকোহল, ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি দেহে গ্রোথ হরমোন তৈরিতে বাঁধা প্রদান করে ও করটিসল উত্পাদিত হয়। ফলে লম্বা হবার পথে বাধা প্রাপ্ত হয়।

মানসিক চাপ দেহ লম্বা হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিরাট বাঁধা
রাতে না ঘুমানো, যেকোনো মানসিক চাপ যার কারণে শরীরের গ্রোথ হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং করটিসল উৎপাদিত হয়। করটিসল কমাতে ভিটামিন C সম্পূরকসমূহ সাহায্য করে।

জানতে চাই  ওজন কমানোর উপায়

Niacin supplementation
Niacin হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ভিটামিন নামক ভিটামিন B3। সাধারণ মানুষের বৃদ্ধি থেকে ৫০০গ্রাম নিয়াসিন সেবন করা মানুষের লম্বা হওয়ার প্রবণতা বেশি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানবদেহের বৃদ্ধির প্রায় ৮০% নির্ভর করে আপনার বংশের উপর। বাকি ২০% প্রভাব থাকে আপনার পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও আপনার দৈনন্দিন কার্যকলাপের উপর। সুতরাং এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে আপনিও লম্বা হতে পারবেন।

লম্বা হওয়ার ব্যায়াম
যোগব্যায়ামের অভ্যাস উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রতিদিন নিয়মিত নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করলে দেহে ঘুমের সময় যে গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়, তা উৎপন্ন করে এবং আমাদের লম্বা হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। ট্রাইঅ্যাঙ্গেল পোজ, মাউন্টেইন পোজ, কোবরা পোজ, প্লিজেন্ট পোজ, ট্রি পোজ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের ব্যায়াম লম্বা হওয়ার বিশেষ ভাবে সহায়ক। যদি ব্যায়াম করতে খুব বেশী ভালো না লাগে তবে প্রতিদিন হাঁটুন, প্রতিদিন বাই-সাইকেল চালান বা প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ১০ সেকেন্ড করে ঝুলে থাকবেন। যেকোনো কঠিন শারীরিক ব্যায়াম আপনাকে লম্বা হতে সাহায্য করবে। তবে অবশ্যই ২১বছর বয়স হওয়ার পর করবেন। লম্বা হবার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

প্রয়োজনে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন
নিজের উচ্চতা নিয়ে অনেকেই বেশ হীনমন্যতায় ভুগেন। অনেকের ধারণা লম্বা কম বেশি হওয়ার পেছনে শুধুমাত্র জেনেটিক কিছু ব্যাপার কাজ করে। তবে আপনার পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও আপনার দৈনন্দিন কার্যকলাপের উপরও উচ্চতা কম বেশি হয়। ২০ বছর বয়সেও যদি উচ্চতা সঠিকভাবে না বাড়ে তবে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।